চার লাখ মানুষের চিকিৎসাসেবার একমাত্র ভরসাস্থল লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। অথচ চিকিৎসক ও জনবল সংকট, রোগ নির্ণয়ের যন্ত্রপাতি বিকল এবং দীর্ঘদিন ধরে অস্ত্রোপচার বন্ধ থাকায় ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা। এতে দূরদূরান্ত থেকে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের পোহাতে হচ্ছে চরম দুর্ভোগ। ৫০ শয্যার এ হাসপাতালে মোট চিকিৎসকের পদ রয়েছে ১৬টি। এর মধ্যে আটজন চিকিৎসক প্রেষণে অন্য হাসপাতালে কর্মরত। ফলে রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত রয়েছেন মাত্র আটজন চিকিৎসক। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন একজন শিশু বিশেষজ্ঞ ও একজন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। গাইনি, চর্ম, অর্থোপেডিক ও সার্জারিসহ বিভিন্ন বিভাগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকট থাকায় কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন রোগীরা। হাসপাতালটির সমস্যার এখানেই শেষ নয়। ডিজিটাল এক্স-রে মেশিন সাত দিন ধরে বিকল। আলট্রাসনোগ্রাফি মেশিন দুই বছর ধরে নষ্ট। আর চার বছর ধরে বন্ধ রয়েছে অস্ত্রোপচার কার্যক্রম। ফলে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসার জন্য রোগীদের ছুটতে হচ্ছে বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। এতে বাড়ছে চিকিৎসার ব্যয় ও ভোগান্তি। হাসপাতালে ৩২ জন নার্সের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ১৮ জন। এ ছাড়া উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের ২৮টি কমিউনিটি ক্লিনিকেও চিকিৎসক ও জনবল সংকট রয়েছে। হাসপাতালের ভবনগুলোর স্যাঁতসেঁতে ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ নিয়েও রয়েছে অভিযোগ। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে হাসপাতালে চারজন চিকিৎসকের মাধ্যমে ফি দিয়ে বৈকালিক স্বাস্থ্যসেবা চালু করা হয়েছিল। তবে বর্তমানে সেই সেবাও বন্ধ রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গাইনি চিকিৎসকসহ প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক থাকলে প্রতিদিন ৫০ থেকে ৭০ জন গর্ভবতী নারীকে চিকিৎসাসেবা দেওয়া সম্ভব হতো। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রায়পুর উপজেলার প্রায় চার লাখ মানুষের চিকিৎসাসেবার অন্যতম প্রধান সরকারি প্রতিষ্ঠান এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২০০৮ সালে হাসপাতালটিকে ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও জনবল নিশ্চিত করা হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। ফলে ব্যাহত হচ্ছে হাসপাতালের স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা। সোমবার দুপুর ১২টার দিকে সরেজমিনে হাসপাতালে গিয়ে কয়েকজন রোগীর স্বজনের সঙ্গে কথা হয়। খুশবু আক্তারসহ তাঁদের কয়েকজন জানান, হাসপাতালে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে না পেরে বাইরে থেকে এক্স-রে করাতে হয়েছে। এ জন্য তাঁদের ৪০০ টাকা খরচ হয়েছে। গাইনি, অর্থোপেডিক, মেডিসিন ও সার্জারিসহ বিভিন্ন বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকায় চিকিৎসা নিতে গিয়ে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তাঁরা। রোগীদের আরও অভিযোগ, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরও অনেক সময় সময়মতো চিকিৎসকের দেখা পাওয়া যায় না। নার্সদের বিরুদ্ধে অসহযোগিতা ও দুর্ব্যবহারের অভিযোগও করেছেন কেউ কেউ। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যুক্ত করা প্রয়োজন। এদিকে, হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ও উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নাইমা নুসরাত জাবিনের কর্মস্থলে উপস্থিতি নিয়েও রোগীদের কয়েকজন অভিযোগ করেছেন। তাঁদের দাবি, সোমবার দুপুরে তাঁকে হাসপাতালে পাওয়া যায়নি। তবে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্যও রয়েছে। মোবাইল ফোনে ডা. নাইমা নুসরাত জাবিন বলেন, চিকিৎসক ও জনবল সংকটের কারণে বহির্বিভাগ ও অন্তর্বিভাগের রোগীদের মানসম্মত সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। আটজন চিকিৎসক প্রেষণে রয়েছেন। বিষয়টি সিভিল সার্জনসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তাঁর বাসা নোয়াখালীর মাইজদীতে হওয়ায় সরকারি গাড়িতে যাতায়াত করতে হয় বলেও জানান তিনি। লক্ষ্মীপুরের সিভিল সার্জন ডা. বাহারুল আলম বলেন, তিন মাস আগে রায়পুর হাসপাতাল থেকে পদোন্নতি পেয়ে তিনি সিভিল সার্জন হিসেবে যোগ দিয়েছেন। রায়পুর হাসপাতালে গাইনি চিকিৎসকসহ প্রয়োজনীয় জনবল সংকটের বিষয়টি স্থানীয় সংসদ সদস্য ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। চার লাখ মানুষের চিকিৎসাসেবার দায়িত্বে থাকা হাসপাতালটির এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগ, বিকল যন্ত্রপাতি সচল এবং অস্ত্রোপচার কার্যক্রম চালুর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাঁদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে এবং রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিশ্চিত হবে মানসম্মত চিকিৎসাসেবা।