লক্ষ্মীপুরের রায়পুরসহ জেলার পাঁচটি উপজেলার সরকারি হাসপাতালকে কেন্দ্র করে অ্যাম্বুলেন্স মালিক-চালকদের একটি সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, এই সিন্ডিকেটের বাইরে থাকা কোনো অ্যাম্বুলেন্সচালক হাসপাতাল থেকে রোগী নিতে পারেন না। ফলে জরুরি মুহূর্তে রোগী ও তাদের স্বজনদের চরম দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে বাধ্য হয়ে নির্দিষ্ট অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার করতে হচ্ছে এবং অতিরিক্ত ভাড়াও গুনতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। এদিকে রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রধান ফটকের সামনে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০টি বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স অবস্থান করায় সাধারণ মানুষের চলাচলেও বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে। হাসপাতালের ভেতরে মসজিদের পাশেও নিয়মিত ১০-১২টি অ্যাম্বুলেন্স রাখা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। চালকদের মধ্যে ভাড়া নিয়ে প্রায়ই বাকবিতণ্ডা ও মারামারির ঘটনা ঘটায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার ১০ জন সশস্ত্র আনসার সদস্য মোতায়েন করেছে। বৃহস্পতিবার সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত এক রোগীকে রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে নেওয়ার প্রস্তুতি নিলে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া নিয়ে দুই চালকের মধ্যে তর্ক শুরু হয়। একপর্যায়ে হাসপাতাল চত্বর থেকে অন্য কোনো অ্যাম্বুলেন্সে রোগী নেওয়া যাবে না বলে বাধা দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, কয়েকজন এসে এক চালকের পক্ষ নিয়ে মারমুখী আচরণ করেন এবং দ্রুত হাসপাতাল ত্যাগ করতে চাপ দেন। এক রোগীর স্বজন অভিযোগ করেন, রায়পুর ও সদর হাসপাতাল—উভয় জায়গাতেই ভাড়া নিয়ে দরকষাকষি ও চালকদের মধ্যে ঝগড়া প্রায়ই দেখা যায়। সিন্ডিকেটের কারণে বাইরের অ্যাম্বুলেন্সে রোগী নেওয়া সম্ভব হয় না। অন্যদিকে এক অ্যাম্বুলেন্সচালক বলেন, কয়েকজন চালক নিয়ম ভেঙে কম ভাড়ায় রোগী নেওয়ায় প্রায়ই বিরোধ সৃষ্টি হয়। অনেক সময় খালি গাড়ি নিয়েই ফিরতে হয় অথবা পথে রোগীর অপেক্ষায় থাকতে হয়। জেলার সব হাসপাতালেই একই অভিযোগ খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু রায়পুর নয়, জেলার সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে কেন্দ্র করেও একই ধরনের সিন্ডিকেটের অভিযোগ রয়েছে। বাইরে থেকে রোগী নিয়ে আসা অ্যাম্বুলেন্সগুলোকে হাসপাতাল থেকে ফেরার পথে রোগী নিতে দেওয়া হয় না। হাসপাতাল চত্বরে দাঁড়াতেও বাধা দেওয়া হয়। এতে রোগীরা নির্দিষ্ট কিছু অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অ্যাম্বুলেন্সচালক ও মালিকরা বলছেন, জ্বালানি তেল, এলপিজি, সিএনজি, টায়ার, মবিল, রক্ষণাবেক্ষণ, চালক-সহকারীর বেতনসহ পরিচালন ব্যয় অনেক বেড়েছে। এছাড়া রোগী নিয়ে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় গেলেও অনেক সময় খালি গাড়ি নিয়ে ফিরতে হয়। এমনকি রোগী না থাকলেও সড়ক, সেতু, ফ্লাইওভার, টানেল ও এক্সপ্রেসওয়েতে টোল দিতে হয়। এসব কারণে ভাড়া কমানো সম্ভব হচ্ছে না বলে তাদের দাবি। অ্যাম্বুলেন্স মালিক কল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, দেশে বিআরটিএ নিবন্ধিত প্রায় ৮ হাজার অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে। এর মধ্যে সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে রয়েছে প্রায় ২ হাজার। লক্ষ্মীপুর জেলার পাঁচ উপজেলায় অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে আনুমানিক দেড় থেকে দুই শতাধিক। অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস (খসড়া) নীতিমালা-২০২৩ অনুযায়ী মহানগর এলাকায় প্রথম দুই কিলোমিটারের সর্বোচ্চ ভাড়া ৬০০ টাকা এবং মহানগরের বাইরে ৪০০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে। পরবর্তী প্রতি কিলোমিটারের জন্য ভাড়া ৬০ টাকা। তবে এই খসড়া নীতিমালা এখনো গেজেট আকারে প্রকাশ না হওয়ায় বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি। লক্ষ্মীপুর অ্যাম্বুলেন্স মালিক কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. রাসেল চৌধুরী বলেন, "যে কোনো নিবন্ধিত অ্যাম্বুলেন্সের হাসপাতাল থেকে রোগী পরিবহনের অধিকার রয়েছে। কিন্তু একটি সিন্ডিকেটের কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। এই সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের সংখ্যা বৃদ্ধি, টোলমুক্ত সুবিধা এবং জ্বালানির মূল্য কমানোর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।" রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. বসহারুল আলম বলেন, "বিষয়টি সমাধানের জন্য একাধিকবার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। হাসপাতালের ভেতরে বাইরের অ্যাম্বুলেন্স অবস্থান না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চালকদের মধ্যে ভাড়া নিয়ে প্রায়ই বিরোধ হয়। অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস নীতিমালা দ্রুত চূড়ান্ত হলে নির্ধারিত ভাড়ায় রোগী পরিবহন নিশ্চিত করা সহজ হবে।" লক্ষ্মীপুরের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ আবু হাসান শাহীন বলেন, "স্বাস্থ্যসেবার গুরুত্বপূর্ণ অংশ অ্যাম্বুলেন্স সেবা। সরকারি ও বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। রোগীদের প্রয়োজন অনুযায়ী সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের সংখ্যা বৃদ্ধি, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স পরিচালনায় কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি। অন্যথায় রোগীদের দুর্ভোগ কমবে না।"