প্রকাশ : ... | ... | ...

ফিরে দেখা ৪ আগস্ট: রক্তাক্ত লক্ষ্মীপুর, দুই বছরেও ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় শহীদ পরিবার


সংযুক্ত ছবি

দেয়ালে টাঙানো ছেলের ছবিতে প্রতিদিন ধুলো জমে। সকালে ঘুম থেকে উঠে ছবিটা মুছে দেন মা। তারপর কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে থাকেন। যেন ছবির ভেতর থেকেই একদিন ছেলে ফিরে এসে বলবে, "মা, আমি এসেছি।" কিন্তু দুই বছর পেরিয়ে গেছে। সেই অপেক্ষার আর শেষ হয়নি। ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট লক্ষ্মীপুরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে গুলিতে নিহত হন চার শিক্ষার্থী। আহত হন তিন শতাধিক মানুষ। সময়ের হিসাবে দুই বছর কেটে গেলেও শহীদ পরিবারের কাছে দিনটি যেন এখনো শেষ হয়নি। তাদের প্রশ্ন—তদন্ত শেষ, চার্জশিট হয়েছে, কিন্তু বিচার কোথায়? যে দিন বদলে গিয়েছিল লক্ষ্মীপুর ৪ আগস্ট সকাল থেকেই লক্ষ্মীপুর শহরের পরিবেশ ছিল উত্তপ্ত। এক দফা দাবিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচিতে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, সাধারণ মানুষ, আইনজীবী এবং নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। বাগবাড়ী থেকে শুরু হওয়া মিছিল আদালত এলাকা অতিক্রম করার সময় আরও বড় হতে থাকে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ঢাকা-লক্ষ্মীপুর আঞ্চলিক মহাসড়ক কার্যত আন্দোলনকারীদের দখলে চলে যায়। সেখানে উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিস্থিতি দ্রুত সংঘর্ষে রূপ নেয়। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দু আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, সাবেক যুবলীগ নেতা একেএম সালাহ উদ্দিন টিপুর নেতৃত্বে যুবলীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করেন। প্রথমে মাদাম ব্রিজ এলাকায় গুলিতে নিহত হন সাদ আল আফনান। পরে শহরের তমিজ মার্কেট এলাকার একটি ভবনের ছাদ থেকে দীর্ঘ সময় ধরে গুলি চালানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সেই গুলিতে নিহত হন সাব্বির হোসেন, কাউছার হোসেন বিজয় ও ওসমান গনি। আহত হন তিন শতাধিক মানুষ। অনেকেই গুলিবিদ্ধ অবস্থায় স্থানীয় হাসপাতাল থেকে ঢাকায় নেওয়া হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য, বিকেলের দিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে ক্ষুব্ধ জনতা অভিযুক্ত নেতার দুটি ভবনে আগুন ধরিয়ে দেয়। এরপর তিনি পেছনের পথ দিয়ে সরে যান বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা দাবি করেন। একটি ঘর, যেখানে সময় থেমে আছে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার শফীপুর গ্রামের একটি ছোট্ট বাড়ি। সেখানে এখনো সাব্বির হোসেনের পড়ার টেবিল, বই, পোশাক—সবকিছু আগের জায়গায় রয়েছে। বাবা আমির হোসেন বলেন, "ওর ঘরে ঢুকতে ভয় লাগে। মনে হয়, দরজা খুললেই ছেলে এসে বলবে—আব্বা, আমি এসেছি।" মা মায়া বেগম কথা বলতে গিয়ে বারবার থেমে যান। কান্না চেপে বলেন, "ছেলেকে আর ফিরে পাব না। কিন্তু যারা ওকে মেরেছে, তাদের বিচার দেখে মরতে চাই।" এক পরিবারের ওপর দ্বিগুণ শোক শহীদ সাদ আল আফনানের পরিবারে শোক নেমে এসেছিল আরও আগে। ছেলের মৃত্যুর মাত্র দুই মাস আগে মারা যান পরিবারের কর্তা। স্বামীর মৃত্যু সামলাতে না সামলাতেই আন্দোলনের গুলিতে প্রাণ হারান ছেলে। আফনানের মা নাসিমা আক্তার বলেন, "দুই বছর ধরে আদালতে যাই, মানুষের কাছে যাই, অপেক্ষা করি। বিচার হবে—এই আশাতেই বেঁচে আছি।" তিনি আরও অভিযোগ করেন, মামলা করার পর থেকে নিরাপত্তাহীনতার কারণে অন্যত্র বসবাস করতে হচ্ছে। আহতদের জীবনও থেমে নেই, তবে স্বাভাবিকও নয় সেই দিনের গুলিতে আহত অনেকেই এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। কারও হাতে, কারও পায়ে, কারও শরীরে এখনো গুলির চিহ্ন। অনেকে অভিযোগ করেন, উন্নত চিকিৎসার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। কেউ শ্রমিকের কাজ করতে পারছেন না, কেউ আবার দীর্ঘদিন কর্মহীন। এক আহত আন্দোলনকারী বলেন, "গুলির ক্ষত শুকিয়েছে, কিন্তু ব্যথা যায়নি।" তদন্তে কী হলো? ৪ আগস্টের ঘটনায় সাদ আল আফনান ও সাব্বির হোসেন হত্যা মামলাসহ একাধিক মামলা হয়। এছাড়া অপর দুই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেও মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, মোট তিনটি মামলায় ৩২৮ জন নামীয় এবং ১ হাজার ১৫০ জন অজ্ঞাত আসামির বিরুদ্ধে তদন্ত করা হয়েছে। ভিডিও ফুটেজ, ডিজিটাল তথ্য ও সাক্ষ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ করে ৬২৫ জনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। লক্ষ্মীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হোসাইন মো. রায়হান কাজেমীর ভাষ্য, তদন্তে যাদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে, তাদের বিরুদ্ধেই অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, প্রধান আসামির দেশে অবস্থানের তথ্য না থাকায় এখনো তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। তবে তাকে আইনের আওতায় আনতে চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। রাজনীতির বাইরে একটি প্রশ্ন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দিলেও একটি বিষয়ে প্রায় সবাই একমত—ঘটনার বিচার হওয়া প্রয়োজন। জেলা বিএনপির নেতারা এটিকে ছাত্র-জনতার গণআন্দোলন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতারা বিচার ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন। দুই বছর পরও উত্তর মেলেনি জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে লক্ষ্মীপুর, ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে লক্ষ্মীপুর জেলার ১৭ জন প্রাণ হারান। প্রতিটি পরিবারের গল্প আলাদা। কোথাও সন্তান হারিয়েছেন বাবা-মা। কোথাও স্বামী হারিয়েছেন স্ত্রী। কোথাও বাবাহারা হয়েছে ছোট্ট শিশু। দুই বছর পরও তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি একই রয়ে গেছে—বিচার কবে হবে? ৪ আগস্ট এখন শুধু একটি তারিখ নয়। এটি লক্ষ্মীপুরের মানুষের কাছে শোক, প্রতিরোধ, সাহস এবং ন্যায়বিচারের দীর্ঘ অপেক্ষার প্রতীক। সময় এগিয়েছে, ক্যালেন্ডার বদলেছে, সরকার বদলেছে। কিন্তু শহীদ পরিবারের ঘড়ির কাঁটা যেন এখনো থেমে আছে সেই রক্তাক্ত বিকেলেই।