বৃষ্টিভেজা পথে মাথায় গরুর ঘাসের বোঝা নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন রায়পুরের দেবীপুর গ্রামের বৃদ্ধ আবুল খায়ের।-
বৃষ্টিভেজা গ্রামের ইটের পথ। আকাশে মেঘ, চারপাশে নিস্তব্ধতা। সেই পথ ধরে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছেন এক বৃদ্ধ। মাথায় গরুর জন্য কাটা ঘাসের বোঝা, হাতে একটি লাঠি। বয়স আশির কোঠায়, তবু থামার সুযোগ নেই। কারণ ঘাস না হলে গরু দুধ দেবে না, আর দুধ না হলে চলবে না সংসার। এই মানুষটির নাম আবুল খায়ের। বাড়ি লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার দেবীপুর গ্রামে। বয়সের ভারে শরীর নুয়ে পড়েছে, হাঁটতে কষ্ট হয়, মাঝেমধ্যে ক্লান্ত হয়ে বসে পড়েন। কিন্তু জীবন তাঁকে বিশ্রামের অনুমতি দেয়নি। শনিবার (১১ জুলাই) বিকেলে গরুর জন্য ঘাস কেটে বাড়ি ফেরার পথে তাঁর সঙ্গে কথা হয়। পরনে শুধু একটি লুঙ্গি, মাথায় ঘাসের বোঝা। চোখেমুখে বয়সের ছাপ স্পষ্ট, কিন্তু দায়িত্ববোধের কাছে হার মেনেছে শারীরিক দুর্বলতা। জীবনের গল্প বলতে গিয়ে আবুল খায়ের জানান, বাবা নিজাম উদ্দিনের মৃত্যুর পর অল্প বয়সেই সংসারের পুরো দায়িত্ব তাঁর কাঁধে এসে পড়ে। অনেক কষ্ট করে সন্তানদের মানুষ করেছেন। কিন্তু নিয়তির নির্মমতায় তিন সন্তানের মধ্যে দুই ছেলেকে হারিয়েছেন। এখন স্ত্রী ও এক মেয়েকে নিয়ে তাঁর ছোট্ট সংসার। সরকারি কোনো বয়স্ক ভাতা বা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধাও জোটেনি তাঁর ভাগ্যে। আক্ষেপের সুরে তিনি বলেন, "মেম্বার বইলা আছিল কার্ড করে দিব। কিন্তু এই পর্যন্ত কিছুই দিল না।" স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের প্রতিও তাঁর অভিমান কম নয়। তিনি বলেন, "এলাকার চেয়ারম্যান-মেম্বাররা নিজেদের নিয়াই ব্যস্ত। আমার কোনো খোঁজখবরও নেয় না।" সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী মুহূর্ত আসে যখন তাঁর স্ত্রীর নাম জানতে চাওয়া হয়। কিছুক্ষণ চুপ থেকে স্মৃতি হাতড়ে তিনি বলেন, "নামটা ঠিক মনে নাই... বয়স যে কত!" বয়সের ভারে স্মৃতি ঝাপসা হয়ে এলেও সংসারের দায়িত্ব ভুলে যাননি তিনি। আবুল খায়ের জানেন, যতদিন শরীরে শক্তি থাকবে, ততদিন মাঠেই যেতে হবে। তাঁর কণ্ঠে ফুটে ওঠে জীবনের নির্মম বাস্তবতা—"বৃষ্টি হোক আর ঝড় হোক, গরুর জন্য ঘাস নিতে হইবো। ঘাস না নিলে গরু দুধ দিব না, আর দুধ বিক্রি না করলে আমাগো সংসারও চলবে না।" স্থানীয়দের ভাষ্য, আবুল খায়ের একজন সৎ, পরিশ্রমী ও আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন মানুষ। বয়সের ভারেও তিনি কারও কাছে হাত পাতেন না। নিজের শ্রমেই জীবনের শেষ অধ্যায় পার করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু তাঁর আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। গ্রামের এই নিরীহ বৃদ্ধের গল্প হয়তো কোনো সরকারি নথিতে লেখা নেই। নেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতেও। তবু প্রতিদিন মাথায় ঘাসের বোঝা তুলে তিনি যেন বলে চলেছেন—জীবন থেমে থাকে না। সমাজের বিত্তবান মানুষ কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সামান্য সহায়তা হয়তো আবুল খায়েরের জীবনের শেষ বয়সটুকু একটু স্বস্তির করে তুলতে পারে। কারণ জীবনের দীর্ঘ সংগ্রামের পর একজন মানুষ অন্তত শেষ বয়সে একটু নিশ্চিন্তে বাঁচার অধিকার রাখেন।