নির্মাণকাজে দীর্ঘসূত্রতা, প্রশাসনিক জটিলতা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতিতে আটকে থাকা লক্ষ্মীপুর জেলা সদর হাসপাতালের ২৫০ শয্যার নতুন ভবনের নির্মাণকাজ অবশেষে প্রায় আট বছর পর আবার শুরু হয়েছে। বুধবার (৭ আগস্ট) ভবনটির নির্মাণকাজ পুনরায় শুরু করা হয়।
প্রায় ৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিতব্য নয়তলা ভবনটির কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও কয়েক বছর ধরে তা পড়ে ছিল অসম্পূর্ণ। ফলে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও নতুন ভবনটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা সম্ভব হয়নি। এতে জেলার বিপুলসংখ্যক মানুষ আধুনিক ও উন্নত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অন্যদিকে ১০০ শয্যার পুরোনো ভবনে ধারণক্ষমতার কয়েক গুণ বেশি রোগীর চিকিৎসা দিতে গিয়ে প্রতিদিনই তৈরি হচ্ছে চরম ভোগান্তি।
আট বছরেও শেষ হয়নি কাজ
হাসপাতাল ও স্থানীয় গণপূর্ত অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, লক্ষ্মীপুরের মানুষের চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ২০১৭ সালের মার্চে জেলা সদর হাসপাতালকে ১০০ শয্যা থেকে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করার ঘোষণা দেওয়া হয়। পরে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নয়তলা নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
২০১৮ সালের জুনে ‘রূপালী জিএম অ্যান্ড সন্স’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ভবনটির নির্মাণকাজ শুরু করে। চুক্তি অনুযায়ী ২০২০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করে ভবনটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও কাজ শেষ হয়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গণপূর্ত বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে প্রকল্পটি বছরের পর বছর ঝুলে ছিল। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নির্মাণকাজ অসমাপ্ত রেখে চলে যায়। এরপর দীর্ঘ সময় কাজ বন্ধ থাকে।
১০০ শয্যার হাসপাতালে রোগী ৪০০-৫০০
নতুন ভবন চালু না হওয়ায় ১০০ শয্যার পুরোনো ভবনেই চলছে পুরো চিকিৎসা কার্যক্রম। হাসপাতাল সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ রোগী অভ্যন্তরীণ বিভাগে ভর্তি থাকছেন। ফলে নির্ধারিত শয্যা না পেয়ে অনেক রোগীকে বারান্দা, করিডোর এমনকি মেঝেতে বিছানা পেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা কয়েকজন রোগী বলেন, দিনের পর দিন মেঝেতে শুয়ে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। পর্যাপ্ত শয্যা না থাকায় রোগীদের স্বাভাবিক চিকিৎসা পরিবেশও ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া ও শিশু রোগীর চাপ বেড়ে গেলে পরিস্থিতি আরও সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে।
যন্ত্রপাতি আছে, নেই আইসিইউ চালুর জনবল
হাসপাতালটির সংকট শুধু অবকাঠামোতেই সীমাবদ্ধ নয়। রয়েছে জনবল সংকটও। প্রায় দুই বছর আগে ১০ শয্যার নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) ও আইসোলেশন ওয়ার্ডের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি হস্তান্তর করা হলেও দক্ষ জনবলের অভাবে আইসিইউ এখনো চালু করা সম্ভব হয়নি।
ফলে সংকটাপন্ন রোগীদের জরুরি চিকিৎসার জন্য ঢাকাসহ অন্যান্য জেলার হাসপাতালে পাঠাতে হচ্ছে। এতে রোগী ও স্বজনদের ভোগান্তির পাশাপাশি চিকিৎসা ব্যয়ও বাড়ছে।
২৫০ শয্যার চাপ সামলাচ্ছে ৫০ শয্যার জনবল
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ২৫০ শয্যার হাসপাতালের সমপরিমাণ রোগীর চাপ থাকলেও এখনো অনেকাংশে ৫০ শয্যার জনবল কাঠামো দিয়েই চিকিৎসাসেবা চালাতে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পদ খালি রয়েছে।
এর প্রভাব পড়ছে বহির্বিভাগের চিকিৎসাসেবায়। প্রতিদিন শত শত রোগী চিকিৎসা নিতে এসে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকছেন। পর্যাপ্ত চিকিৎসক না থাকায় অনেক রোগীকে অপেক্ষা করতে হচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
এই সুযোগে হাসপাতালকেন্দ্রিক দালাল চক্রের তৎপরতাও বাড়ছে বলে অভিযোগ করেছেন রোগী ও স্বজনেরা। টিকিট সংগ্রহসহ বিভিন্ন সেবার নামে রোগীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।
‘নতুন ভবন চালু হলে সংকট অনেকটাই কমবে’
শুক্রবার (৭ আগস্ট) দুপুরে সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ও নবাগত সিভিল সার্জন বাহারুল আলম এবং আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. অরূপ পাল বলেন, মূলত অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণেই হাসপাতালের স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে।
তাঁরা জানান, প্রতিদিন গড়ে ছয় শতাধিক রোগী বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসেন। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ বিভাগেও ধারণক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত রোগী ভর্তি থাকেন। দিন দিন রোগীর চাপ বাড়ছে।
তাঁদের ভাষ্য, নতুন ভবনটি নির্মাণ শেষে পুরোপুরি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হলে শয্যাসংকট অনেকটাই কমবে। তখন রোগীদের বারান্দা বা মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দেওয়ার পরিস্থিতিও দূর হবে।
জনবল ও স্থানসংকটের মধ্যেও চিকিৎসক-নার্সরা সাধ্যমতো রোগীদের নিরবচ্ছিন্ন সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছেন বলেও জানান তাঁরা।
দ্রুত কাজ শেষ করার দাবি
স্থানীয় নাগরিক নেতারা বলছেন, জেলার বিপুলসংখ্যক মানুষের চিকিৎসাসেবা একটি অসমাপ্ত ভবনের কারণে বছরের পর বছর ব্যাহত হতে পারে না। তাঁদের মতে, প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার পাশাপাশি দ্রুততম সময়ে নির্মাণকাজ শেষ করে ভবনটি চালু করতে হবে।
একই সঙ্গে দীর্ঘদিন পড়ে থাকা আইসিইউ চালু করতে প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল নিয়োগেরও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
‘১০০ শয্যায় ২৫০ শয্যার চিকিৎসা সম্ভব নয়’
লক্ষ্মীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেন, ২৫০ শয্যার হাসপাতাল অনুমোদন হলেও বর্তমানে ১০০ শয্যার অবকাঠামোর মধ্যে কোনোভাবে চিকিৎসাসেবা চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এভাবে দীর্ঘদিন চিকিৎসাসেবা দেওয়া সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, নতুন ভবনের নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দ্রুত কাজ শেষ করে ভবনটি চালু করা গেলে জেলার মানুষের দীর্ঘদিনের চিকিৎসাসংকট অনেকটাই কমে আসবে।