মেঘনার ভয়াল নদীভাঙনে লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার অন্তত পাঁচটি গ্রাম বিলীনের শঙ্কায় রয়েছে। বছরের পর বছর ধরে চলা ভাঙন চলতি বর্ষা মৌসুমে আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে উপজেলার বিস্তীর্ণ জনপদ মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। ইতোমধ্যে প্রায় ১০ হাজার মানুষ নদীভাঙনের সরাসরি হুমকির মধ্যে জীবনযাপন করছেন।
উপজেলার দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়নের টুনুর চর, চরকাছিয়া, উত্তর চরবংশী ইউনিয়নের চরবংশী ও কাছিয়ার চর এবং দক্ষিণ চরআবাবিল ইউনিয়নের জালিয়ারচর এলাকায় মেঘনা নদীর পশ্চিম তীরে ভয়াবহ ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। গত এক দশকের তুলনায় এ বছর ভাঙনের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
সোমবার (১৩ জুলাই) সরেজমিনে দেখা যায়, জালিয়ারচরের সাজু মোল্লারঘাট পর্যন্ত নদীর তীরজুড়ে প্রতিনিয়ত ভেঙে যাচ্ছে ফসলি জমি, বসতভিটা ও চলাচলের রাস্তা। সাজু মোল্লারঘাট এলাকার আশ্রয়ণকেন্দ্রের সামনের একমাত্র সড়কের একটি অংশ ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। অবশিষ্ট অংশও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
ভাঙনের কারণে শত শত বিঘা কৃষিজমি নদীগর্ভে চলে গেছে। অনেক পরিবার একাধিকবার ঘরবাড়ি সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। অনেকে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন। চরবংশী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও মন্দিরও এখন ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে।
বর্ষা মৌসুমে দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। কাদায় সড়ক চলাচল অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। নদীভাঙনের কারণে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় শিক্ষার্থী, কৃষক ও সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা সোলায়মান খান বলেন, “প্রতিবছর শতাধিক পরিবার নদীভাঙনের শিকার হচ্ছে। আমরা ভূমিহীন হয়ে যাচ্ছি। সরকার দ্রুত স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ করলে অন্তত অবশিষ্ট বসতভিটা রক্ষা পাবে।”
চৌধুরী মিয়া বলেন, “রাহুলঘাট থেকে টুনুর চর হয়ে সাজু মোল্লারঘাট পর্যন্ত কয়েক কিলোমিটার এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। শত শত বিঘা জমি হারিয়ে গেছে।”
দেলোয়ার হোসেন খান বলেন, “জালিয়ারচর এলাকায় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও জামে মসজিদও ভাঙনের মুখে। দুই শতাধিক পরিবার এলাকা ছেড়ে চলে গেছে। আমি নিজেই চার থেকে পাঁচবার বাড়ি সরিয়েছি।”
অভিভাবক মায়মুনা বেগম বলেন, “যে সামান্য রাস্তা ছিল, সেটিও ভেঙে যাচ্ছে। শিশুরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিদ্যালয়ে যায়। আমার সন্তানও সড়কের ফাটলে পড়ে আহত হয়েছে।”
ষাটোর্ধ্ব খাদিজা বেগম বলেন, “বিয়ের পর তিনবার ঘর সরিয়েছি। এখন যে ঘর আছে, সেটিও ভাঙনের মুখে। আর কোথাও ঘর তোলার জায়গা নেই।”
শিক্ষার্থী জামিলা খানম বলেন, “রাস্তাঘাট ভেঙে যাওয়ায় স্কুল-কলেজে যেতে খুব কষ্ট হয়। কৃষিজমিও হুমকির মুখে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আমাদের জীবন-জীবিকা আরও সংকটে পড়বে।”
এ বিষয়ে জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী নাহিদ উজ-জামান খান বলেন, চরবংশী ও চরআবাবিল ইউনিয়নের টুনুর চর, আলতাফ মাস্টারঘাট, রাহুলঘাট, পানিরঘাট, চান্দারখাল, বায়ড়াঘাট ও জালিয়ারচরের সাজু মোল্লারঘাট এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে নদীভাঙন প্রতিরোধ প্রয়োজন। এর আগে আলতাফ মাস্টারঘাট ও সাজু মোল্লারঘাট এলাকায় জিও ব্যাগ ফেলে প্রতিরক্ষা কাজ করা হয়েছে। বাকি এলাকাগুলোর জন্য উন্নয়ন প্রকল্প (ডিপিপি) অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। অনুমোদন পেলেই ভাঙনরোধে স্থায়ী কাজ শুরু করা হবে বলে জানান তিনি।
এদিকে, ভাঙনকবলিত এলাকার বাসিন্দাদের একটাই দাবি—স্থায়ী নদীশাসনের মাধ্যমে অবশিষ্ট জনপদ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কৃষিজমি ও বসতভিটা রক্ষা করা হোক, যাতে রায়পুরের আরও কোনো গ্রাম মেঘনার গর্ভে হারিয়ে না যায়।