লক্ষ্মীপুরের রায়পুর ৫০ শয্যা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দীর্ঘদিনের জনবল সংকটে স্বাস্থ্যসেবা কার্যত ভেঙে পড়েছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, নার্স, কর্মচারী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীসহ ২০৩টি অনুমোদিত পদের মধ্যে ৯৭টি শূন্য রয়েছে। ফলে প্রতিদিন চিকিৎসা নিতে আসা শত শত রোগী কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাবে প্রায় দুই বছর ধরে নিয়মিত অস্ত্রোপচারও বন্ধ রয়েছে।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের প্রায় চার লাখ মানুষের একমাত্র সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০০ রোগী বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসেন। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুবিধা সীমিত থাকায় অনেক রোগীকেই বাইরে তিন গুণ পর্যন্ত বেশি খরচে পরীক্ষা করাতে হচ্ছে।
হাসপাতালে আধুনিক অপারেশন থিয়েটার, অস্ত্রোপচারের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও একজন বিশেষজ্ঞ অবেদনবিদ থাকলেও গাইনি সার্জন ও অন্যান্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাবে নিয়মিত অস্ত্রোপচার চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে প্রসূতিসহ জরুরি রোগীদের অতিরিক্ত ব্যয়ে জেলা শহরের বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকে যেতে হচ্ছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, ২০০৬ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হাসপাতালটিকে ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করেন। তবে শয্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে জনবল বাড়েনি। গত প্রায় দুই দশক ধরেই জনবল সংকটের মধ্যেই চলছে হাসপাতালটির কার্যক্রম।
তথ্য অনুযায়ী, চিকিৎসকের ৩১টি পদের মধ্যে কর্মরত আছেন ১৮ জন। চিকিৎসা কর্মকর্তার আটটি পদের চারটি এবং জুনিয়র কনসালট্যান্টের ১০টি পদের পাঁচটি শূন্য। অর্থোপেডিক, চক্ষু, চর্ম ও যৌনরোগ, নাক-কান-গলা এবং হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের পদ থাকলেও সেখানে কোনো চিকিৎসক কর্মরত নেই।
এ ছাড়া সিনিয়র স্টাফ নার্সের ৩০টি পদের মধ্যে রয়েছেন ১৫ জন। ওয়ার্ড বয়, আয়া ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীর ২৪টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ১১ জন। হাসপাতালের চারটি আবাসিক কোয়ার্টার থাকলেও ভবনগুলো জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সেখানে চিকিৎসকেরা বসবাস করেন না।
হাসপাতালে ২০০৭ সালে অপারেশন থিয়েটার চালু হয় এবং ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নিয়মিত অস্ত্রোপচার চলেছে। এরপর জনবল ও জেনারেটর-সংক্রান্ত সমস্যার কারণে কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, জরুরি প্রয়োজন হলে সীমিত পরিসরে অস্ত্রোপচার করা হয়। তবে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় বিকল্প ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে অস্ত্রোপচার পরিচালনায় চরম ভোগান্তি তৈরি হয়।
প্রায় তিন বছর আগে স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় একটি বড় জেনারেটরসহ কোটি টাকার চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ করা হলেও সেগুলোর অনেকগুলো ব্যবহার না হওয়ায় অচল অবস্থায় পড়ে রয়েছে।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে হাসপাতালের বহির্বিভাগে চিকিৎসাসেবা নিয়েছেন ১৫ হাজার ৬৭৮ জন রোগী। এর মধ্যে ১১ হাজার ৭৬৩ জন নারী এবং ৪ হাজার ৯৩১ জন শিশু। গত জুন মাসে প্রতিদিন গড়ে ৫৪ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন।
সোমবার (৬ জুলাই) সরেজমিনে হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, রোগীর চাপ সামাল দিতে বিভিন্ন ওয়ার্ডের বারান্দায় অতিরিক্ত শয্যা রাখা হয়েছে। পুরোনো ভবনের কক্ষগুলোতে অনেক রোগীকে মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। অপারেশন থিয়েটারটি তালাবদ্ধ অবস্থায় পাওয়া যায়। পরে দায়িত্বপ্রাপ্ত নার্সের সহায়তায় কক্ষটি খুলে দেখা যায়, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সংরক্ষিত থাকলেও নিয়মিত অস্ত্রোপচার হচ্ছে না।
চরআবাবিল ইউনিয়নের উদমারা গ্রামের বাসিন্দা কুলসুমা আক্তার বলেন, “ছয় দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি আছি। চিকিৎসক নিয়মিত দেখছেন। কিন্তু প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য বাইরে গিয়ে অনেক বেশি টাকা খরচ করতে হচ্ছে।”
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা বাহারুল আলম বলেন, “বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় নিয়মিত অস্ত্রোপচার চালু রাখা যাচ্ছে না। জনবল সংকটের বিষয়টি প্রতি মাসেই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হচ্ছে। স্থানীয় সংসদ সদস্যকেও বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে।”
এদিকে হাসপাতালের বাউন্ডারি ওয়াল না থাকায় গত এক মাস ধরে চোর ও মাদকসেবীদের আনাগোনা বেড়েছে বলে অভিযোগ করেছেন হাসপাতাল-সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, জনবল সংকটের পাশাপাশি নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাও হাসপাতালটির সেবার মানকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।