ভিসা জালিয়াতির মাধ্যমে প্রকৃত পাসপোর্টধারীর পরিবর্তে অন্য এক নারীকে ইতালিতে পাঠানোর অভিযোগে সংঘবদ্ধ মানবপাচার চক্রের মূলহোতা হিসেবে অভিযুক্ত লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার বেলায়েত হোসেন ওরফে বাবু জমাদ্দারসহ সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
রোববার (২০ জুলাই) রাজধানীর গুলশান-১ এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। এ ঘটনায় গুলশান থানায় মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০২৬ এবং দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারায় মামলা হয়েছে।
অভিযানে জমাদ্দার ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলসের অফিস থেকে ৫৬টি বিভিন্ন ব্যক্তির পাসপোর্ট, সরকারি-বেসরকারি ও বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যবহৃত ১৫৩টি সিল, একটি এম্বোস সিল, তিনটি সিপিইউ, একটি ল্যাপটপ এবং নগদ ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা জব্দ করা হয়।
গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিরা হলেন-
১. মো. বেলায়েত হোসেন (৪০), পিতা- মো. লোকমান হোসেন, মাতা- মোছা. শাহানারা বেগম, সাং- জয়পুরা, থানা- রামগঞ্জ, জেলা- লক্ষ্মীপুর।
২. নাজমুল হাসান (১৯), পিতা- মৃত মনির হোসেন, মাতা- মোছা. সামসুনাহার, সাং- দিশুয়া, থানা- রামগঞ্জ, জেলা- লক্ষ্মীপুর।
৩. মেহেদী হাসান (৩৭), পিতা- মৃত রফিকুল ইসলাম, মাতা- মোছা. দেলোয়ারা বেগম, সাং- জয়পুরা, থানা- রামগঞ্জ, জেলা- লক্ষ্মীপুর।
৪. মো. সোলাইমান সুমন (৩২), পিতা- এম. এ. মো. আব্দুস সাত্তার, মাতা- মোছা. রহিমা বেগম, সাং- রতনপুর, থানা- রামগঞ্জ, জেলা- লক্ষ্মীপুর।
৫. ফজলে রাব্বী (২৭), পিতা- মৃত সিরাজুল ইসলাম, মাতা- পারভিন বেগম, সাং- জয়পুরা, থানা- রামগঞ্জ, জেলা- লক্ষ্মীপুর।
৬. মো. তৌহিদুর রহমান (২৪), পিতা- সাইফুল মোল্লা, মাতা- রেকসনা, সাং- আন্ডারচর (বড় মোল্লাবাড়ী), থানা- কালকিনী, জেলা- মাদারীপুর।
৭. কাওসার হোসেন (৪২), পিতা- মৃত আমির হোসেন, মাতা- মোছা. নাসরিন আক্তার, সাং- বি/৬, লালকুঠি ৩য় কলোনি, মাজার রোড, মিরপুর-১, থানা- দারুস সালাম, ঢাকা।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, ইতালিপ্রবাসী স্বামীর কাছে যাওয়ার আশায় এক নারী ইতালির ভিসা প্রক্রিয়ায় যুক্ত হন। এ সময় অভিযুক্ত নাজমুল হাসান তাকে জমাদ্দার ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলসে নিয়ে গিয়ে প্রতিষ্ঠানপ্রধান বাবু জমাদ্দারের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। ইতালির ভিসা পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে তার কাছ থেকে ধাপে ধাপে ৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা নেওয়া হয়।
পরে ওই নারী সন্তানদের নিয়ে ইতালি যাওয়ার জন্য বিমানবন্দরে গেলে ইমিগ্রেশনে জানতে পারেন, তার পাসপোর্টে থাকা ইতালির ভিসা ব্যবহার করে এর আগেই ২৪ এপ্রিল অন্য এক নারী ইতালিতে চলে গেছেন। তখন তিনি বুঝতে পারেন, তার পাসপোর্ট ও ভিসা জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যবহার করে অন্যকে বিদেশে পাঠানো হয়েছে। পরে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের পরামর্শে তিনি সিআইডির মানবপাচার শাখায় অভিযোগ করেন।
সিআইডির প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, চক্রটি বিদেশে যাওয়ার আগ্রহী ব্যক্তিদের ইতালির ভিসার প্রলোভন দেখিয়ে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিত। পরে তাদের পাসপোর্ট নিজেদের হেফাজতে রেখে জালিয়াতির মাধ্যমে প্রকৃত পাসপোর্টধারীর পরিবর্তে অন্য ব্যক্তিকে বিদেশে পাঠানোর মতো গুরুতর অপরাধ সংঘটিত করত।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, চক্রটির মূলহোতা বাবু জমাদ্দার ২০১৬ সাল থেকে একই কৌশলে প্রায় ৩০ জনকে ইতালিতে পাঠানোর সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং প্রত্যেকের কাছ থেকে বিপুল অর্থ নিয়েছেন বলে তথ্য মিলেছে। এছাড়া একই ধরনের অপরাধে দায়ের হওয়া ২০২৪ সালের একটি মামলায় তিনি বর্তমানে জামিনে রয়েছেন।
সিআইডি জানিয়েছে, জব্দ করা পাসপোর্ট, সিল, কম্পিউটারসহ অন্যান্য আলামতের ফরেনসিক পরীক্ষা, আর্থিক লেনদেনের অনুসন্ধান এবং দেশ-বিদেশে থাকা চক্রটির অন্যান্য সদস্য ও সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের শনাক্তে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
এ ঘটনায় বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে সরকার অনুমোদিত বৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণ এবং কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে যাচাই-বাছাই ছাড়া পাসপোর্ট বা অর্থ হস্তান্তর না করার আহ্বান জানিয়েছে সিআইডি।