লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়নের চর কাচিয়া গ্রামের খলিফার হাট এলাকায় অবস্থিত বায়তুল নূর জামে মসজিদ। স্থানীয় এক প্রবাসীর উদ্যোগে কাতারের এক ব্যবসায়ীর অর্থায়নে প্রায় এক বছর আগে দৃষ্টিনন্দনভাবে নির্মাণ করা হয় মসজিদটি। একই সঙ্গে নির্মাণ করা হয় আধুনিক অজুখানা ও টাইলস-সংবলিত টয়লেট। তবে মসজিদের সৌন্দর্যের আড়ালে রয়ে গেছে এক নীরব মানবিক বেদনা—এখনো একটি জরাজীর্ণ টিনের ঘরেই বসবাস করছেন মসজিদের ইমাম।
জানা যায়, ১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত বায়তুল নূর জামে মসজিদটি দীর্ঘদিন টিনশেড ছিল। ২০২৪ সালে বিদেশি অনুদানে এটি পাকা ও দৃষ্টিনন্দন ভবনে রূপ পায়। কিন্তু মসজিদের ডান পাশে আধুনিক অজুখানা ও টয়লেট নির্মাণ হলেও ইমামের জন্য তৈরি করা হয় টিনের একটি ছোট কক্ষ, যার চালের বিভিন্ন স্থানে ছিদ্র রয়েছে। ফলে বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি ঘরের ভেতরে চুইয়ে পড়ে।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মরিচাধরা টিনের চাল দিয়ে তৈরি ওই কক্ষটিই ইমাম কারী নাজমুল হোসেনের একমাত্র আবাসস্থল। বৃষ্টি হলেই বিছানা, কাপড়-চোপড় ও প্রয়োজনীয় বইপত্র ভিজে যায়। অনেক সময় রাতভর ঘরের এক কোণ থেকে আরেক কোণে সরে গিয়ে রাত কাটাতে হয় তাঁকে।
ইমাম কারী নাজমুল হোসেন জানান, প্রায় তিন বছর ধরে তিনি এ মসজিদে ইমামতি করছেন। পাশাপাশি তিনি রায়পুর কামিল মাদ্রাসায় অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত। মসজিদ থেকে মাসিক ৭ হাজার টাকা বেতন পান। এছাড়া প্রাইভেট পড়ানো ও একটি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করে তাঁর মোট মাসিক আয় প্রায় ২০ হাজার টাকা। সেই আয়ের মধ্য থেকেই প্রতি মাসে পরিবারের জন্য প্রায় ১০ হাজার টাকা পাঠাতে হয়। তিনি পরিবারের বড় ছেলে। তাঁর এক বোন নবম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে এবং আরেক বোনের বিয়ে হয়েছে।
তিনি বলেন, “মসজিদের দায়িত্ব পালন করতে আমার কোনো কষ্ট নেই। কিন্তু বৃষ্টি হলে ঘরের ভেতরে পানি পড়ে। বিছানা ও বইপত্র ভিজে যায়। অনেক সময় রাত জেগে কাটাতে হয়। শুধু একটি নিরাপদ থাকার জায়গা হলে দায়িত্ব পালন আরও স্বাচ্ছন্দ্যে করতে পারতাম। আগে আরও খারাপ জায়গায় ছিলাম। একদিন ঘরের ভেতরে সাপও ঢুকে পড়েছিল। পরে এই টিনের ঘরটি তৈরি করে দেওয়া হয়।”
স্থানীয় মুসল্লিরা জানান, জুমার দিনে এ মসজিদে প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ মুসল্লি নামাজ আদায় করেন। সুন্দর মসজিদ ও আধুনিক অজুখানা নির্মাণে সবাই আনন্দিত। তবে যিনি প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে ইমামতি করেন, শিশুদের কোরআন শিক্ষা দেন এবং ধর্মীয় দায়িত্ব পালন করেন, তাঁর বসবাস এখনো একটি জরাজীর্ণ টিনের ঘরে। বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক।
তাদের ভাষ্য, একটি মসজিদের সৌন্দর্য শুধু দৃষ্টিনন্দন ভবনে নয়, বরং সেই মসজিদের ইমাম ও খাদেমদের সম্মানজনক জীবন নিশ্চিত করার মধ্যেও নিহিত। একজন ইমাম যদি নিরাপদ ও মানবিক পরিবেশে বসবাস করতে না পারেন, তাহলে উন্নয়নের চিত্রও অপূর্ণ থেকে যায়।
মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি নুরুল আমিন বিএসসি বলেন, “বিদেশি অনুদানে মসজিদের মূল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। ইমামের জন্য একটি ভালো আবাসন নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা আমরা উপলব্ধি করছি। অর্থের ব্যবস্থা হলে ভবিষ্যতে এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের মতে, ইসলামে ইমাম ও আলেমদের যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা দেওয়ার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অথচ বাস্তবে অনেক জায়গায় মসজিদের অবকাঠামো উন্নত হলেও ইমামদের আবাসনের বিষয়টি অবহেলিত থেকে যায়।
চর কাচিয়ার খলিফার হাট বায়তুল নূর জামে মসজিদের চিত্র যেন সেই বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, প্রবাসী ও দানশীলরা এগিয়ে এসে ইমামের জন্য একটি নিরাপদ ও সম্মানজনক আবাসন নির্মাণে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবেন।