প্রায় ছয় বছর ধরে বন্ধ রয়েছে লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলা শিল্পকলা একাডেমির কার্যক্রম। প্রশাসনের অনাগ্রহ, দীর্ঘদিন কমিটি না থাকা এবং প্রয়োজনীয় উদ্যোগের অভাবে একাডেমিটি কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মীদের অভিযোগ, মাঝে মাঝে লোক দেখানো কিছু কার্যক্রম ও প্রকল্পের নামে সরকারি অর্থ ব্যয় হলেও শিল্পকলা একাডেমির নিয়মিত কার্যক্রম চালু করা হয়নি। ফলে উপজেলার শিল্প-সংস্কৃতি চর্চা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
এদিকে, ২০২৪ সালে রায়পুর থানার সামনে কৃষি বিভাগের জমিতে ও একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে একটি আর্ট স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়। সেখানে চিত্রাঙ্কনের পাশাপাশি নৃত্য, সংগীত, বাদ্যযন্ত্র শিক্ষা ও স্পোকেন ইংলিশসহ বিভিন্ন কোর্স পরিচালিত হচ্ছে।
তবে আর্ট স্কুলের পরিচালক (অধ্যক্ষ) শংকর মজুমদারের বিরুদ্ধে সম্প্রতি নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, শুরুতে ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হলেও পরে কয়েকজনকে বাদ দিয়ে নিজের পছন্দের শিক্ষক দিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এছাড়া ইসলাম ধর্মীয় শিক্ষা চালুর আবেদন করা হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন অভিভাবক। অভিভাবক বাহারুল আলম ও সুমনের দাবি, পরিচালকের কারণে বিষয়টি এগোয়নি।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রায়পুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) সরকারি বাসভবনের পাশেই ২০২১ সালে তৎকালীন ইউএনও শারমিন আলম উপজেলা শিল্পকলা একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু প্রতিষ্ঠার পর অল্প কিছুদিন কার্যক্রম চললেও পরে তা বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে ভবনটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে এবং বিভিন্ন সরঞ্জাম নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
প্রতিষ্ঠার কিছুদিন পর স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মী মো. খোকা, টিটু বড়ুয়াসহ কয়েকজনের উদ্যোগে ভবনটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়। পাশের শিশু নিকেতন একাডেমি থেকে বিদ্যুৎ সংযোগও দেওয়া হয়েছিল। কিছুদিন সংস্কৃতিকর্মীদের আনাগোনা থাকলেও ২০২২ সালের জুলাইয়ের পর পুনরায় একাডেমিতে তালা ঝুলে যায়।
অভিযোগ রয়েছে, কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও সরকারি বরাদ্দে ভবনের মেরামত, টিন পরিবর্তন ও রং করার কাজ হয়েছে। এডিপির অর্থায়নে সর্বশেষ ভবনটির সংস্কার করা হলেও শিল্পচর্চা চালুর কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এ অবস্থায় ভবনটিতে বহিরাগতদের আনাগোনারও অভিযোগ উঠেছে।
জানা যায়, সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে সভাপতি করে প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মীদের সমন্বয়ে এক সময় একটি পরিচালনা কমিটি গঠন করা হলেও সেটি কার্যকর হয়নি। এরপর আর নতুন কোনো কমিটি গঠন করা হয়নি। স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মীদের দাবি, শিল্পকলা একাডেমির জন্য নির্ধারিত স্থানটিও যথাযথ নয়।
সামাজিক সংগঠক ও সংস্কৃতিকর্মী এম এ রহিম ও বাহারুল আলম অভিযোগ করে বলেন, সাবেক ইউএনও অঞ্জন দাস শিল্পকলা একাডেমির কার্যক্রম বন্ধ করে আর্ট স্কুল চালু করেন। একজন হিন্দু পুরুষ ও একজন মুসলিম নারী শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হলেও পরে মুসলিম নারী শিক্ষককে বাদ দিয়ে পরিচালকের পরিচিত একজন শিক্ষককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রায়পুর আর্ট স্কুলের পরিচালক (অধ্যক্ষ) শংকর মজুমদার। তিনি বলেন, "আমার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ ভিত্তিহীন। শিক্ষক নিয়োগ বা বাদ দেওয়ার এখতিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার। বর্তমানে সব শিক্ষক ও কর্মচারী রয়েছেন। শুধু একজন মুসলিম শিক্ষক ব্যক্তিগত কারণে চাকরি ছেড়ে গেছেন।"
রায়পুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেহেদী হাসান কাউছার বলেন, "উপজেলা শিল্পকলা একাডেমির কার্যক্রম পুনরায় চালুর লক্ষ্যে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, সংস্কৃতিকর্মী ও সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করা হবে। শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে সংগীত, নৃত্য, চারু ও কারুকলার চর্চার সুযোগ সৃষ্টি করা হবে। আর্ট স্কুলের অভিযোগগুলোর বিষয়েও খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।"