লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জেনারেটর থাকলেও জ্বালানি (ডিজেল) বরাদ্দ না থাকায় তা চালানো যাচ্ছে না। ফলে বিদ্যুৎ চলে গেলেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এক্স-রে, প্যাথলজি পরীক্ষা ও নেবুলাইজারের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবা। এতে দূরদূরান্ত থেকে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও স্বজনদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর অনেকে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা না করিয়েই বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন।
সোমবার (৩১ আগস্ট) সকালে রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যুৎ না থাকায় হাসপাতালের বিভিন্ন কক্ষে রোগী ও স্বজনদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এক্স-রে কক্ষের সামনেও ছিল রোগীদের ভিড়। প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষা করেও বিদ্যুৎ না আসায় অনেকে এক্স-রে না করিয়েই চলে যান।
কাঞ্চনপুর গ্রাম থেকে ছয় বছরের শিশুকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে আসা পারুল বেগম ও সুইটি আক্তার বলেন, গরমের মধ্যে টিকিটের জন্য দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে। এরপর চিকিৎসক দেখানোর পর এক্স-রে করানোর প্রয়োজন হলেও বিদ্যুৎ না থাকায় তা করা সম্ভব হয়নি।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের অভিযোগ, কখন বিদ্যুৎ আসবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। ফলে দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগীরা দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন।
জ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি থাকা ছয় বছরের শিশু মাইমুনা আক্তারের মা মারুফা বেগম বলেন, চার দিন ধরে জ্বর ও নিউমোনিয়ায় ভুগছে তাঁর সন্তান। সাইচা এলাকা থেকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে এসে বিদ্যুৎ না থাকায় সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কষ্ট করতে হয়েছে।
সরেজমিনে আরও দেখা যায়, লোডশেডিংয়ের কারণে হাসপাতালের রোগ নির্ণয়ের বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। নির্ধারিত কক্ষের সামনে রোগী ও স্বজনেরা অপেক্ষা করছেন। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর অনেককে ফিরে যেতেও দেখা যায়।
চর আবাবিক গ্রাম থেকে চার বছরের শিশুকে টিকা দিতে হাসপাতালে এসেছিলেন মিনু আক্তার। কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকায় টিকা সংরক্ষণের ফ্রিজ খোলা যাচ্ছিল না। এতে তাঁকেও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়।
মিনু আক্তার বলেন, ‘দূর থেকে কষ্ট করে বাচ্চাকে টিকা দিতে হাসপাতালে এসেছি। এসে দেখি বিদ্যুৎ নেই। ফ্রিজও খোলা যাচ্ছে না। গরমের মধ্যে বাচ্চাকে নিয়ে প্রায় দেড় ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে। হাসপাতালে এসে যদি টিকার জন্যও এতক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়, তাহলে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কষ্টের শেষ কোথায়?’
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, শনিবার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অন্তত আটবার লোডশেডিং হয়েছে। এতে দুর্ভোগে পড়তে হয় উপজেলার দূর-দূরান্ত থেকে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাঁদের স্বজনদের।
হাসপাতাল কর্মকর্তারা জানান, রোববার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৮৬ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ২০ জন নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের শ্বাসকষ্ট কমাতে নেবুলাইজার দেওয়া জরুরি হলেও বিদ্যুৎ না থাকায় নিয়মিত এই সেবা দেওয়া যাচ্ছে না।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, বিদ্যুৎ চলে গেলে রোগীদের চিকিৎসাসেবা চালু রাখতে একজন ব্যক্তির দান করা একটি জেনারেটর রয়েছে। কিন্তু ডিজেলের বরাদ্দ না থাকায় প্রয়োজনের সময় সেটি চালানো সম্ভব হচ্ছে না।
হাসপাতালের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘জেনারেটর থাকলেও ডিজেল না থাকায় সেটি চালানো যাচ্ছে না। ফলে বিদ্যুৎ চলে গেলে বিকল্প কোনো ব্যবস্থা থাকে না। যন্ত্রনির্ভর সব কাজ বন্ধ থাকে। এক্স-রে, প্যাথলজি ও নেবুলাইজারের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবাগুলো দেওয়া যায় না। দুই থেকে তিন মাস ধরে লোডশেডিংয়ের কারণে এমন সমস্যা বেশি হচ্ছে।’
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে একটি আইপিএস থাকলেও দীর্ঘক্ষণ বিদ্যুৎ না থাকলে সেটিও বন্ধ হয়ে যায়। জরুরি রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহৃত কিছু যন্ত্রপাতি বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় বিদ্যুৎ চলে গেলে চিকিৎসকদের কাজ ব্যাহত হয়।
এদিকে আধুনিক সরঞ্জামে সুসজ্জিত অস্ত্রোপচার কক্ষ থাকলেও চিকিৎসক ও জ্বালানি-সংকটের কারণে গত তিন বছর ধরে সেখানে অস্ত্রোপচার করা যাচ্ছে না বলে জানা গেছে। ২০০৬ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করেন। এরপর প্রায় ২০ বছর ধরে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি নানা সংকটের মধ্য দিয়ে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। উপজেলার প্রায় চার লাখ মানুষ এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ওপর নির্ভরশীল।
এ ছাড়া গত তিন বছর ধরে স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় পাওয়া বড় একটি জেনারেটরসহ কোটি টাকা মূল্যের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি অচল পড়ে আছে বলেও জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) মামুনুর রশিদ বলেন, ‘বিদ্যুৎ না থাকলে চিকিৎসাসেবায় সমস্যা হয়। রোগীদের দুর্ভোগও বাড়ে। হাসপাতালে জেনারেটর আছে। কিন্তু জেনারেটর চালানোর জন্য জ্বালানি প্রয়োজন। জ্বালানি বরাদ্দ না থাকায় জেনারেটর চালানো সম্ভব হচ্ছে না। তারপরও আমরা রোগীদের সেবা দিতে সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছি।’
লোডশেডিংয়ের বিষয়ে লক্ষ্মীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক শফিউল আলম বলেন, দৈনিক চাহিদার তুলনায় প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ কম বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। এ কারণে লোডশেডিং হচ্ছে। বিষয়টি জানিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে।